মননশীল বই মানবাত্মার অমর আলোকঃ আলমগীর শাহরিয়ার

ছাতকবাজার ছাতকবাজার

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০
নিউজ শেয়ার করুনঃ

মননশীল বই মানবাত্মার অমর আলোকঃ আলমগীর শাহরিয়ার

জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক লেখক ছফার সঙ্গে এক আলাপচারিতায় বলেছিলেন, “যখন কোনো নতুন জায়গায় যাইবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানার চেষ্টা করবেন। ওই জায়গার মানুষ কী খায়। আর পড়ালেখা কী করে। কাঁচাবাজারে যাইবেন, কী খায় এইডা দেখনের লাইগ্যা। আর বইয়ের দোকানে যাইবেন পড়ালেখা কী করে হেইডা জাননের লাইগ্যা। আমি একবার তুরস্কের বইয়ের দোকানে যাইয়া দেখলাম, বামপন্থী বই আর ধর্মীয় বইপত্র সব দোকানে সাজাইয়া রাখছে। বইয়ের দোকান পরখ করলেই বেবাক সমাজটা কোনদিকে যাইতাছে, হেইডা টের পাওন যায়। আরেকবার কায়রো গিয়া দেখলাম মজুরশ্রেণির মানুষেরা বড় বড় গামলা ভরতি কইরা বরবটি জাতীয় ভেজিট্যাবল আরাম কইরা খাইতাছে। মোটাসোটা মানুষ। খাওনের পরিমাণটাও তেমন। কী খায়, কী পড়ে এই দুইডা জিনিস না জানলে একটা জাতির কোনো কিছু জানন যায় না।” — ‘যদ্যপি আমার গুরু’, আহমদ ছফা।

সুনামগঞ্জের প্রকৃতি ও শিল্পসমৃদ্ধ একটি উপজেলা ছাতকের যে এলাকায় বড় হয়েছি, বেড়ে উঠেছি সেখানকার এক প্রসিদ্ধ বাজারে দুইটা বইয়ের দোকান ছিল(মূলত গাইড বইয়ের দোকান ও স্টেশনারিজ)। পত্রিকা পড়া ও নতুন বইপত্র কিছু আসল কিনা তা দেখার জন্য রোজই সেখানে ঢু মারতাম। তো সেখানে ছিল কাসেম বিন আবু বকরের ‘ফুটন্ত গোলাপ’, এমডি মুরাদ, মিতুল নামে এক লেখকের ‘বোরকা পরা সেই মেয়েটি’— এ জাতীয় সস্তা ও চটুল প্রেমের বই। আর ছিল ‘স্বামী-স্ত্রীর ছহি মিলন’, ‘বেহেশতি জেওর’, ‘মুকছুদুল মোমিন’, ‘শিশুদের আরবি সুন্দর নাম’ প্রভৃতি। হঠাৎ ব্যতিক্রম ও ভিন্ন স্বাদের বইও দু একটা পাওয়া যেত। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদ ছাড়াও ওপার বাংলার জনপ্রিয় লেখক যেমন বুদ্ধদেব গুহের ‘মাধুকরী’, সমরেশ মজুমদারের ‘সাতকাহন’ বা সুনীলের ‘সেই সময়’ প্রভৃতির নিউজপ্রিন্ট। তালিকা দেখে নিশ্চয়ই রাজ্জাক স্যারের ভাষায় ‘বেবাক সমাজটা’র মন ও মনন সম্পর্কে একটি পরিচ্ছন্ন ধারণা পাওয়া যায়। ধারণা করি এ চিত্র সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেরই চিত্র।

তবে ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু গোয়েন্দা সিরিজের বই আমাদের হাতে পৌঁছাতো। এক্ষেত্রে শাহীদুল ইসলাম নামে উপরের ক্লাসে পড়া আমার এক খালাতো ভাই খুব উৎসাহী ও আগ্রহী পাঠক ছিলেন। নিজেদের ছোটখাটো একটি ব্যবসা দেখে দেখেই উনি নিজের একাডেমিক পড়াশোনা ও মননশীল অনেক বই পড়ে ফেলেছিলেন। সিলেট শহরে উনি প্রতি সপ্তাহান্তে বৃহস্পতিবার ব্যবসায়িক কাজে যেতেন এবং অবধারিতভাবে কিছু নতুন বইপত্র কিনে আনতেন। প্রবল আগ্রহ ও আতিশয্যে আমরা কজন বুভুক্ষু পাঠক তাঁর ফেরার জন্য অপেক্ষা করতাম। সপ্তাহকে তখন মাসাধিক কাল মনে হত। তিনি বিশেষ করে গোয়েন্দা সিরিজের নতুন বই নিয়ে আসতেন। যেমন মাসুদ রানা, দস্যু বনহুর সিরিজ, ইতিহাসভিত্তিক কিছু উপন্যাস প্রভৃতি।

বিশেষ করে মনে পড়ছে ক্রুসেডের উপর লেখা বই, স্পেনে মুসলমানদের গৌরবগাঁথা নিয়ে ইতিহাসভিত্তিক কিছু উপন্যাস, নাম মনে পড়ছে না ব্রিটিশ ভারতে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের উপর বড় একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস, শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ ও রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’, জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’-সহ আরও অনেক অনেক বই তাঁর সংগ্রহ থেকেই স্কুলের ছাত্রাবস্থায় পড়েছি। এছাড়া, স্থানীয় বাজারে পত্রিকার হকারের কাছ থেকে তিনি নিয়মিত ‘ক্রীড়াজগৎ’-এর মতো কিছু স্পোর্টস ম্যাগাজিন সংগ্রহ করতেন। পত্রিকার কখনও নিয়মিত, কখনও অনিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। বলতে দ্বিধা নেই এই খালাতো ভাইটি পাঠ-প্রতিকূল ওই এলাকায় আমার মতো আরও অনেকের পাঠকসত্তা তৈরিতে বড় একটি ভূমিকা রেখেছেন। তিনি অনেকের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ছিলেন।

সিলেট শহরে আসার পর প্রথম সমৃদ্ধ লাইব্রেরির সন্ধান পাই। সেটা শাহজালাল মাজার(দরগা গেইট) সংলগ্ন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ। সবুজ ঘাসের ছোট্ট আঙিনায় লাল ইট বিছানো পথ পেরিয়ে আসাম অঞ্চলের পুরনো স্থাপত্য রীতিতে তৈরি বাংলো টাইপের সাদা রঙের টিনশেড ভবন। প্রবেশ পথের পাশে ১৩শ শতকের প্রাচীন একটি শিলালিপি চোখে পড়ে। ভবনের দক্ষিণ পাশ শহীদ সুলেমান হল উত্তর পাশ দুর্লভ অনেক বইয়ে সমৃদ্ধ সিলেটের প্রাচীন লাইব্রেরি(নুরুল হক দশঘরী এর প্রতিষ্ঠাতা। দার্শনিক দেওয়ান আজরফ প্রমুখ উপমহাদেশের প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠান মুসলিম সাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠার সময় সাহিত্যিক ও গবেষক নুরুল হককে সহযোগিতা করেন)।আকবর নামে একটি ছেলে অভ্যর্থনা টেবিলে বসে থাকে। তাঁর রেজিস্টার খাতায় নাম সই করে রোজ পড়তে যাই(২০০৪, ০৫, ০৬, ০৭ এই ক বছর রেজিস্টার খাতায় নিয়মিত সে নাম সই খুঁজে পাওয়া যাবে)। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় এক পাশে পত্রিকা পাঠের একটি রুম।

সিলেট সরকারি কলেজে তখন উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। ক্লাস শেষে কলেজ বাসে ফিরি। এবং রোজ বিকেল বা সন্ধ্যায় পড়তে যাই। দোতলার ছোট্ট রুমে বরষার দিনে জানালা দিয়ে প্রায়ই সিলেটের বিখ্যাত ঝুম বৃষ্টির ছাঁট এসে গাঁয়ে লাগে। যেদিন খুব বৃষ্টি নামে সেদিন পাঠকের সংখ্যা কম থাকে। একটু আয়েশ করে পত্রিকা বা বই পড়া যায়। পাঠকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দরগা মাদ্রাসার ছাত্র। চাকরিজীবী কেউ কেউও সন্ধ্যার দিকে সেখানে ভীড় করেন। বিএনপি জোট সরকারের আমলের কথা বলছি। প্রায়ই দেখতাম সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কবি কবি চেহারার পাটের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে আসেন এবং পছন্দের বই নিয়ে যান। পড়া শেষে জমা দেন। সিলেটের বিশিষ্টজনদের মধ্যে তাঁকে আমি এই প্রাচীন গ্রন্থাগার ব্যবহার করতে অনেকবার দেখেছি। এখানে সুলেমান হলে কবি আল মাহমুদ ও আসাদ চৌধুরীকে প্রথম দেখি।

এ ছাড়া স্টেডিয়াম সংলগ্ন সিলেট গণগ্রন্থাগার। সম্ভবত বিএনপির অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান তাঁর দায়িত্বকালে এটি নির্মাণ করেন। বেশ সুদৃশ্য একটি গণগ্রন্থাগার। শত শত বইয়ের সমাহার। শিশু কর্নারও আছে। খোঁজে পাওয়া যায় পছন্দের অনেক বই। যদিও পাবলিক লাইব্রেরিতে সরকারি বরাদ্দে শত শত আবর্জনাও কেনা হয়ে থাকে। সেগুলো বইয়ের তাকে সাজানো থাকে। তাই লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার হলেই আপনি আপনার আগ্রহ বা পছন্দের বই সবসময় না-ও পেতে পারেন। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল সিলেট মহিলা কলেজ সংলগ্ন মননশীল বইয়ের দোকান ‘বইপত্র’। জিন্দাবাজার এলাকায় মামাদের বাসা হওয়ায় বেশ ছোটবেলা থেকে ছোট্ট কিন্তু সাজানো গোছানো এই বইয়ের দোকানটি দেখতাম। পাশ দিয়ে যাওয়া আসার সময় চাতক পাখির মত তাকিয়ে থাকতাম।

লেখকঃ কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও সমাজ বিজ্ঞানী।